তখন আমার বয়স ছিল উনিশ-কুড়ি। সবে উচ্চ মাধ্যমিকের চৌহদ্দি পেরিয়ে শিক্ষাজীবনের পরবর্তী অধ্যায় শুরু করেছি। বয়সজনিত সরলতায় আমার উচ্ছ্বলতা তখন আকাশছোঁয়া। নতুন পাওয়া বন্ধুদের মধ্যে আদর ছেলেটাকে ভাল লাগতো। কিন্তু অবচেতন মনেও তাকে ভবিষ্যত জীবনের সঙ্গী হিসেবে ভাবিনি কখনো। একে বয়সে ছোট, তাছাড়া তখনি প্রেমে জড়ানোর ইচ্ছেও ছিল না তেমন। তবে এর বিপরীতে আবার নিঃসঙ্গতাও ছিল মনের ভেতর। উচ্চ মাধ্যমিকের সময় সরল কিছু ভুলের ভীষণ জটিল বিচারের কারণে তখন আমি সমাজের চোখে সর্বস্বান্ত ছিলাম। তখন মনে হতো, জীবনে কেউ কোনদিন ভালবাসবে না আর। আবার আশাও ছিল, হয়তো কেউ সমাজের সেই একচোখা বিচারের অগভীর কলংকের কুঁয়াশা তাড়িয়ে আমার আসল চেহারাটা দেখবে; কেউ আমাকেও ভালবাসবে আবার।

 

নতুন শিক্ষাজীবনের তৃতীয় মাসেই বার্ষিক বনভোজনের তারিখ ঠিক হয়েছিল। ব্যাচের সবার সাথে আমি আর আদরও গিয়েছিলাম। সেই বনভোজনের প্রস্তুতির সময় তোমাকে প্রথম দেখি; কি নিপুন, দক্ষ হাতে পুরো আয়োজনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলে তখন তুমি। সাংগঠনিক কাজ আমার ভীষণ ভাল লাগতো। কখন যেন নিজের অজান্তেই তোমার মত সংগঠক হবার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলাম। সেই স্বপ্নটাই সম্ভবতঃ তখন তোমার কাছ থেকে, তোমার মত হওয়াটা শিখতে আমায় অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। আনমনেই তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আগামী চারটা বছর আমি তোমার মত হবার চেষ্টাই করে যাবো। অতীতের ভুলগুলোর কারণে তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনটাকে তোমার কাছ থেকে শেখা সেই সাংগঠনিক দক্ষতায় গুছিয়ে নেবার আশায় তখন আমি বেঁচে থাকার নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছিলাম।

 

সেই বনভোজনে যাওয়ার সময় এবং ফেরার পথেই আমার জীবনের মোড় আরেকবার ঘুরে যাওয়া শুরু করেছিল। যতবার বাসচালকের মাথার ওপরে থাকা আয়নাটায় চোখ পড়েছে ততবারই দেখেছি, তুমি আমাকে দেখছো। প্রথম দিকে মনে হয়েছে হয়তো কাকতালীয়ভাবেই আয়নাতে চোখে চোখ রাখছো তুমি। কিন্তু একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম, না, তুমি আমাকেই দেখছো। আমার চেহারায় তখন অবাক বিস্ময় আর আরক্ত লজ্জার লুকোচুরি খেলা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তার আড়ালে হতবাক হয়ে ভাবছিলাম, আমার মাঝে কী দেখছে তোমার মত একজন সুদর্শন, মেধাবী এবং সম্ভাবনাময় পুরুষ! তুমি কি আমার অতীতের কলংক-গ্লানির কথা জানো? তখন জানতে ইচ্ছে হয়েছিল, তোমাকে সেই বিচারের রায়গুলো জানাবার পরেও কি এইভাবেই আমাকে দেখবে তুমি। আবোল-তাবোল ভাবছি ভেবে যতবারই মনকে শাসন করে আয়নায় চোখ রেখেছি, ততবারই দেখেছি তুমি স্নিগ্ধ হাসিমাখা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছো। কি আজব ব্যাপার! কী দেখছো তুমি? আমাকে জানাবে একবার? আমি তবে নিজের মাঝেও সেটা দেখে একটা অবলম্বন খুঁজে পেতাম, বেঁচে থাকার।

 

শহরে ফিরতে ফিরতে রাত নয়টার বেশী বেজে গিয়েছিল। বাস থেকে নামার পর বিদায় নেবার সময় তুমি জানতে চেয়েছিলে, “বাসায় ফিরতে সমস্যা হবে না তো? হলে বলো, আদরকে বলি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে!”

 – “না, স্যার, সমস্যা হবে না। আমি পারবো।” আমি সলজ্জ উত্তর দিয়েছিলাম। আদরের সাথে আমার আগেই কথা হয়েছিল, ও আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজের বাসায় যাবে।

– “তোমার বাসা কোথায়?” তুমি জানতে চেয়েছিলে।

– “ধানমণ্ডি, স্যার।”

– “ওহহো, আদরের বাসা তো গাবতলী। আমিও তো ধানমণ্ডিতেই থাকি। একটু অপেক্ষা করলে আমার সাথেও যেতে পারো।”

– “না, না স্যার! আমি পারবো।” চকিত উত্তর দিয়ে মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম, ভাগ্যিস  কার্টুনের মত বাস্তব জীবনে মানুষের চোখ দু’টো কখনো কখনো বৃত্তাকার থেকে উল্টানো পান পাতার আকৃতি ধারণ করে না। 

– “আচ্ছা, পৌঁছে তবে জানিও। আমার ফোন নম্বর আছে তো?”

– “জ্বী স্যার আছে। এখন আসি, দোয়া রাখবেন।”

– “ফি আমানিল্লাহ।” তুমি দোয়া করেছিলে।

আমার আলসে মন ভাবছিল, এমন একজন ধর্মপরায়ন, যত্নশীল মানুষ যদি আমার জীবনের দায়িত্ব নিতে চাইতো, তবে আর কষ্ট করে নিজেকে সেটা গোছানোর পরিশ্রম করতে হতো না। তোমার মত একটা সন্তান বড় করার সুযোগ পেতাম।  

 

গেটের বাইরে আদর তার বাইকে ওঠার সময় জানতে চেয়েছিল, “রিকশা খুঁজে নিতে পারবি, না কাউকে বলবো, খুঁজে দিতে?”

– “মানে? তুই পৌঁছে দিবি না!”

– “না, মানে স্যারকে তো বললি না, যে আমার সাথে কথা হয়েছে তোকে পৌঁছে দিবো।”

– “আদর! ফাতরামি করবি না। স্যার যদি ভাবে আমি তোর সাথে প্রেম করি!”

– “ও, আচ্ছা! আর এখন বাইকে উঠে যেতে দেখলে যদি সেই কথাই ভাবে?”

– “তুই এত জটিল কেন? দরকার নাই আমাকে পৌঁছে দেবার। তুই যা তোর মত।” এইটুকু বলে আমি আদরের সামনেই ধানমণ্ডি রিকশা ঠিক করে চলে গিয়েছিলাম। আর পরের যে কটা বছর সহপাঠী ছিলাম, এই ঘটনাটা নিয়ে আর কোন কথা বলেনি আদর।

 

আমিও আদরকে বলিনি তখন, সেই রাতে অর্ধেক রাস্তা এসে আমি রিকশা ঘুরিয়ে আবারও ফিরে গিয়েছিলাম। তখন কোন জীবন-জুয়ারীর প্রেতাত্মা মনে হয় আমার ঘাড়ে সওয়ার হয়েছিল। তুমি তখনো সেখানে ছিলে। আদরের জটিল ভাবনার বিরহে চোখে অশ্রু নিয়েই তোমাকে প্রশ্ন করেছিলাম, “স্যার, বাসায় পৌঁছে দিবেন?” এরপর, পথের কোথাও আমি নিজের সব কান্নাগুলো তোমার কাধে উজাড় করে দিয়েছিলাম। আরো পরে, অন্য কোন ঘরে, নিজের শরীরটাকেও তোমার চরণে সমর্পন করেছিলাম। তারপর, তোমার বিষাক্ত নখ আর দাঁতের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়া শেষে জেনেছিলাম, তোমার এখন আরো লেখাপড়া প্রয়োজন। তুমিই বলেছিলে। আমার কথা শুনবার বা শরীর কামড়াবার সময় তোমার হাতে আর ছিল না তখন।

 

কয়েক মাস পর, শেষ পর্যন্ত অনেক সাহস করে আমি শুধু সেই বনভোজনের রাতে নিজের ফিরে যাওয়া ছাড়া বাকী কথাগুলো আদরকে জানিয়েছিলাম। আদর একটু ভেবে বলেছিল, “শোন, এক হাতে তালি বাজে না। তুই সুযোগ দিয়েছিস বলেই সে ঐ কাজটা করার সাহস পেয়েছে। মেয়ে হিসেবে তোর আরো সংযত থাকা উচিত ছিল। যা হবার হয়ে গেছে, এখন আর বিষয়টা নিয়ে হৈ-চৈ করিস না। অকারণে একজন সম্ভাবনাময় এবং সুযোগ্য শিক্ষকের সম্মান আর ক্যারিয়ারে কলংকের দাগ পড়ে যাবে। এইটা করার কোন অধিকার নাই তোর। মেয়ে মানুষ পাত্তা দিলে পুরুষ এই কাজ করবেই। আল্লাহ এইভাবেই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তোর কোরআন পড়া উচিত। নিয়মিত পড়বি। না বুঝলেও, না বুঝেই পড়তে থাকবি। মন শান্ত থাকবে। নিজেকে অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখতে পারবি। পুরুষদের উত্তেজিত করা থেকে বিরত থাকা সম্ভব হবে। বুঝেছিস?”

 

তখন সত্যিই বুঝিনি, আদর।

 

এখন আমি বুঝি। কিন্তু আদর, তুই কি জানতি না, আমিই সেই পশুটার প্রথম শিকার ছিলাম না? বা শেষ শিকারও হতে পারিনি? আমাকে লেখাপড়ার ভণ্ড অজুহাত দিয়ে সে তার পরবর্তী শিকার ধরার ফাঁদ সাজাতেই ব্যস্ত হয়েছিল। আমরাও তাকে সফল শিকারী হিসেবেই টিকে থাকার সুযোগ দিয়েছিলাম। এখন তাই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, “আদর, শুধু নারীই কি পুরুষকে উত্তেজিত, সম্মোহিত করে? না কোন পুরুষের মায়ায় সম্মোহিত হলে তার দায়টুকুও নারীর ওপরেই বর্তায়? এখন আমি জানি, সেই রাতে আমার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছেটার পেছনে সারাদিন আমার চোখের সাথে ঐ পশুটার খেলা করার বড় ভূমিকা ছিল। না কি বাইশেই আমার আঠাশের মত বিচক্ষণ হওয়া উচিত ছিল, আদর, নারী হবার অপরাধে? সেই দিন কি তুই পুরুষ হয়ে আরেক পুরুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে অবচেতন মনে নিজের বীর্য ছেটানোর পথটাই পরিষ্কার রেখেছিলি?”

 

এখন আর তোকে এই প্রশ্নগুলো করার সুযোগ নাই। তুই এখন বঙ্গোপসাগরের কোণায় সম্মান নামক মূর্তির উপাসনায় ব্যস্ত। আমি প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে, মানুষের গান গাই। কিন্তু এখন আমি জানি, সেইদিন তোর আর আমার নীরব থাকায় দরবেশগুলোর পশুত্বটাই নরমাংসের ভোজে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে আরো। তাই আর চুপ থাকবো না, আদর!

 

এখন আমি একাই বলবো! 


#MeToo

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s